
কোনো ছাড় বা ব্যতিক্রম ছাড়াই ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম আমদানিতে 25% শুল্ক আরোপের ট্রাম্পের ঘোষণায় সোমবার সম্ভাব্য বাণিজ্যযুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। তবে শুল্ক কার্যকর হওয়ার তারিখ মার্চের শুরুতে নির্ধারিত হওয়ায়, বাজারের অনেকেই উত্তেজনা বাড়ানোর চূড়ান্ত পদক্ষেপের বদলে একে দর-কষাকষির কৌশল হিসেবে দেখতে শুরু করেন। দৃষ্টিভঙ্গির এই পরিবর্তনে প্রাথমিক উদ্বেগ কিছুটা কমে এবং আগের সতর্ক আশাবাদও উল্টে যায়।
শুল্কের পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হামাসকে শনিবার দুপুরের মধ্যে সব ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দেওয়ার জন্য সতর্ক করেছেন। তা না হলে হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি বাতিল হবে এবং “নরক নেমে আসবে” বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
এদিকে, Reuters-এর সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের কারণে অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ Fed-এর সুদের হার কমানোর সময় পিছিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা করছেন। তবে, New York Federal Reserve-এর এক বছরের মুদ্রাস্ফীতির তুলনামূলকভাবে সংযত পূর্বাভাস University of Michigan-এর জরিপের প্রভাব কমিয়েছে। ওই জরিপে মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি বাড়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল। তা সত্ত্বেও, এক বছরের মুদ্রাস্ফীতির জরিপ বাজারে খুব কম প্রভাব ফেলেছে। পাঁচ বছরের মুদ্রাস্ফীতির প্রত্যাশা আগের মাসের 2.7% থেকে বেড়ে 3% হয়েছে।
এই বাজারের ওঠানামার মধ্যে সোমবার US Dollar Index (DXY) টানা তিন দিনের উত্থান ধরে রাখে। মঙ্গলবারের শুরুর দিকে প্রতিবেদন লেখার সময়ও সূচকটি সামান্য ঊর্ধ্বমুখী ছিল। বাজারের অংশগ্রহণকারীরা Fed চেয়ারম্যান Jerome Powell-এর অর্ধবার্ষিক সাক্ষ্য দেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।
মার্কিন ডলারের উত্থানে EURUSD পেয়ারে চাপ তৈরি হয়েছে। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ECB) প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিন লাগার্দে এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট লুইস দে গুইন্দোস সুদের হার কমানোর ক্ষেত্রে প্রতিটি বৈঠকে আলাদাভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদ্ধতির ওপর জোর দিয়েছেন এবং বাণিজ্যযুদ্ধ এড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। এদিকে, ইউরো অঞ্চলভিত্তিক ফেব্রুয়ারির Sentix বিনিয়োগকারী আস্থার উন্নতিকেও উপেক্ষা করেছে। সূচকটি প্রত্যাশিত -16.3 এবং আগের -17.7 থেকে বেড়ে -12.7 হয়েছে।
এদিকে, জাপানের National Foundation Day ছুটির কারণে USDJPY পেয়ারে গতি নেই। তবে Bank of Japan-এর কড়া অবস্থান এবং JPY-এর নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে পরিচিতির মধ্যেও ইয়েন দুই মাসের সর্বনিম্ন স্তর থেকে আগের পুনরুদ্ধার আর বাড়াতে পারছে না।
মঙ্গলবার, ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের (BoE) মনিটারি পলিসি কমিটির সদস্য ক্যাথরিন মান ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে (FT) বলেছেন, ভোক্তারা খরচ কমিয়ে দেওয়ায় ব্রিটিশ সংস্থাগুলো পণ্যের দাম বাড়াতে হিমশিম খাচ্ছে। মঙ্গলবার প্রকাশিত যুক্তরাজ্যের BRC লাইক-ফর-লাইক খুচরা বিক্রয় পরিসংখ্যানও তাঁর বক্তব্যকে সমর্থন করেছে: জানুয়ারিতে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি (YoY) আগের 3.1% থেকে কমে 2.5% হয়েছে, যেখানে প্রত্যাশা ছিল 0.2%।
BoE-এর নমনীয় নীতির অবস্থান ও হতাশাজনক ব্রিটিশ অর্থনৈতিক তথ্যের পাশাপাশি মার্কিন ডলারের তুলনামূলক শক্তিশালী অবস্থানের কারণে মঙ্গলবারের শুরুর দিকে GBPUSD এক সপ্তাহেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। ট্রেডাররা Fed চেয়ার Powell-এর সাক্ষ্য এবং BoE গভর্নর Andrew Bailey-এর বক্তব্যের অপেক্ষায় রয়েছেন।
অস্ট্রেলিয়ান (AUD), নিউজিল্যান্ড (NZD) এবং কানাডিয়ান (CAD) ডলার এখনও চাপের মধ্যে রয়েছে। তবে শুল্ক এবং চীনের প্রণোদনা নিয়ে আরও খবরসহ গুরুত্বপূর্ণ আপডেটের অপেক্ষায় ট্রেডাররা থাকায় মঙ্গলবার দিনের শুরুতে বিক্রেতাদের চাপ কিছুটা কমেছে। ট্রাম্পের শুল্ক ঘোষণার পাশাপাশি চীনের অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নিয়ে বাজারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এদিকে, অস্ট্রেলিয়ার সেন্টিমেন্ট ডেটাতেও মিশ্র সংকেত মিলেছে, ফলে কয়েক দিনের সর্বনিম্ন পর্যায়ে AUDUSD-এর ওঠানামা সীমিত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশের দৃঢ় সম্পর্ক নিয়ে নিউজিল্যান্ডের অর্থমন্ত্রীর মন্তব্যে NZDUSD তেমন সাড়া দিতে পারছে না। অন্যদিকে, কানাডার গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পণ্য ক্রুড অয়েলের দাম বাড়লেও যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে ভূরাজনৈতিক ও বাণিজ্য উত্তেজনার কারণে USDCAD ঘুরে দাঁড়াচ্ছে।



বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যযুদ্ধের আশঙ্কা, বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে সোনার দাম বেড়ে রেকর্ড $2,945-এ পৌঁছেছিল। এরপর তা কমে প্রায় $2,925-এ নেমে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের ডলার শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও, Fed চেয়ার পাওয়েলের সাক্ষ্য দেওয়ার আগে সোনার ক্রেতারা সতর্ক রয়েছেন।
এদিকে, ইসরায়েল-হামাস সংঘাত নতুন করে শুরু হওয়া এবং ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার উদ্বেগে টানা তৃতীয় দিনের মতো অপরিশোধিত তেলের দর বেড়েছে। সরবরাহে সম্ভাব্য ঘাটতির আশঙ্কাও জ্বালানির দামকে সমর্থন করছে। তবে, 2025 সালের প্রথম প্রান্তিকের পর উৎপাদন বাড়াতে OPEC+-এর প্রস্তুতি এবং আরও তেল উত্তোলনের জন্য ট্রাম্পের চাপ—এই উদ্বেগ কিছুটা প্রশমিত করেছে।
শুল্ক নিয়ে উদ্বেগের সঙ্গে Fed-এর কঠোর অবস্থান Bitcoin (BTCUSD) ও Ethereum (ETHUSD)-এর ক্রেতাদের চাপে ফেললেও, CME-তে ব্যাপক বিক্রির পর short squeeze-এর আশঙ্কায় শীর্ষস্থানীয় ক্রিপ্টোকারেন্সিগুলোতে ক্রয়চাপ বাড়ছে। এতে সপ্তাহের শুরুতে শুরু হওয়া দরবৃদ্ধি আরও এগিয়ে যাচ্ছে। Strategy-এর BTC কেনার জোরালো প্রবণতা এবং Trump-কে ঘিরে শিল্পখাতের আশাবাদও Bitcoin ও Ethereum-কে সমর্থন দিতে পারে।
দিনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে ফেড চেয়ার পাওয়েলের ছয় মাস অন্তর দেওয়া সাক্ষ্য এবং BoE গভর্নর বেইলির ভাষণ। সম্ভাব্য বাজার পরিবর্তনের ইঙ্গিত পেতে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েনের সঙ্গে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সের বৈঠক এবং যুক্তরাজ্য, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মাঝারি পর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের জনসমক্ষে উপস্থিতিও নজরে রাখা জরুরি। ট্রাম্পের শুল্ক ও সীমান্ত পরিকল্পনা এবং মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়া-ইউক্রেনের মধ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার ঘটনাপ্রবাহও বাজারের দিক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
Fed-এর কঠোর নীতিগত অবস্থানের ইঙ্গিত, BoE-এর আরও সুদ কমানোর প্রত্যাশা এবং শুল্ক ও ভূরাজনৈতিক উদ্বেগের মধ্যে USD-এর শক্তির কারণে GBPUSD চাপে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। পাওয়েল সুদ বাড়ানোর পক্ষে না থাকলেও বা সুদ কমানো স্থগিত করলেও, কিংবা BoE-র বেইলি আশাবাদী সুরে কথা বললেও এই চাপ বজায় থাকতে পারে।
এদিকে, EURUSD, AUDUSD এবং NZDUSD-এর বিক্রেতারা নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারেন, আর USDCAD ও USDJPY সামান্য ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে। তবে সম্প্রতি সোনার দামে ঊর্ধ্বমুখী গতি কম বলে মনে হচ্ছে। আজ API-এর মজুতের পরিমাণ কমলে এবং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা বাড়লে, ক্রুড অয়েলের দরপতন কাটিয়ে ওঠা অব্যাহত থাকতে পারে। ক্রিপ্টো ক্রেতাদের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা কঠিন হতে পারে, আর শেয়ারবাজারে দরপতন দেখা যেতে পারে।
ট্রেডিংয়ে ভাগ্য আপনার সহায় হোক!