
বাণিজ্য, ভূরাজনীতি ও রাজস্বনীতি ঘিরে একের পর এক নেতিবাচক খবর নজর কাড়ায় বাজারে সতর্কতা বেড়েছে। ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালাতে পারে—এমন খবরের পর উত্তেজনা বেড়েছে। সম্ভাব্য করছাঁটের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাটতি আরও বাড়তে পারে—এমন উদ্বেগও চাপ বাড়িয়েছে। চীন ও জাপানের সঙ্গে বাণিজ্য নিয়ে অসন্তোষ এবং সস্তা চীনা আমদানির ওপর G7 দেশগুলোর সমন্বিত শুল্ক আরোপের আশঙ্কাও বাজারের মনোভাবকে দুর্বল করেছে।
সতর্কতামূলক Fed মন্তব্য, Moody’s-এর US ক্রেডিট রেটিং কমানোর পরিণতি এবং US বাণিজ্য আলোচনায় অগ্রগতির অভাব—এসব কারণে ঝুঁকি এড়ানোর প্রবণতা আরও বেড়েছে। এর সবই ঘটেছে অর্থনৈতিক সূচকের হালকা সূচির মধ্যে।
এর প্রতিক্রিয়ায়, US Dollar Index (DXY) দুই সপ্তাহের সর্বনিম্নে নেমেছে, টানা তিন দিনের দরপতন অব্যাহত রেখেছে। অন্যদিকে, Gold টানা তৃতীয় দিন বেড়ে এক সপ্তাহেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
EURUSD দুই সপ্তাহের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি পৌঁছেছে, GBPUSD মাসিক সর্বোচ্চ ছুঁয়েছে, আর USDJPY টানা সপ্তম দিনের মতো কমে দুই সপ্তাহের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। এদিকে, AUDUSD ও NZDUSD ঘুরে দাঁড়ালেও USDCAD দুই সপ্তাহের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাসংশ্লিষ্ট সরবরাহ উদ্বেগে ক্রুড অয়েলের দর বেড়েছে। ক্রিপ্টোকারেন্সির দামও কিছুটা বেড়েছে, তবে ওয়াল স্ট্রিটে দুর্বল লেনদেনের পর এশিয়া-প্যাসিফিকের শেয়ারবাজারগুলো চাপে ছিল। এদিকে, বন্ডের বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকায় ইল্ড বেড়েছে।
টানা তৃতীয় দিনের মতো ইউরোর উত্থান অব্যাহত থাকে। গুরুত্বপূর্ণ রেজিস্ট্যান্স ভেঙে EURUSD দুই সপ্তাহের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠে। ইউরোজোনে ভোক্তা আস্থার উন্নতি, ইইউ-যুক্তরাজ্য বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আশাবাদ এবং মার্কিন ডলারের দুর্বলতা এই উত্থানে সহায়তা করেছে। তবে ECB-র সতর্কতামূলক মন্তব্য এবং ইউরোপের চলমান রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক উদ্বেগও রয়েছে।
ডলারের সার্বিক দুর্বলতা এবং নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ইয়েনের আকর্ষণে USDJPY টানা সপ্তম সেশনেও নিম্নমুখী প্রবণতা বজায় রেখেছে। জাপান থেকে মিশ্র সংকেত এলেও এমনটি হয়েছে। টোকিও মার্কিন বাণিজ্যনীতি নিয়ে সমালোচনা অব্যাহত রেখেছে এবং চুক্তি চূড়ান্ত করার আগে অটো শুল্ক তুলে নেওয়ার বিষয়ে অনড় রয়েছে। এদিকে, রয়টার্সের সর্বশেষ Tankan জরিপে জাপানি উৎপাদন খাতের ব্যবসায়ীদের মনোভাব দুর্বল হয়েছে, আর পরিষেবা খাতের আস্থা অপরিবর্তিত রয়েছে। এপ্রিলে বাণিজ্য তথ্যেও ঘাটতি আরও বেড়েছে—রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কমেছে এবং আমদানি প্রত্যাশার তুলনায় কম হারে কমেছে।
আট মাসের “Cup and Handle” প্যাটার্ন, যুক্তরাজ্যের শক্তিশালী মূল্যস্ফীতির ডেটা এবং মার্কিন ডলারের দুর্বলতার জেরে 1.3435–45-এর গুরুত্বপূর্ণ রেজিস্ট্যান্স জোন ভেঙে ওপরে ওঠায় GBPUSD নজর কেড়েছে। এপ্রিলে মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হওয়ায় BoE-এর সুদের হার কমানোর বাজি পিছিয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র, EU ও ভারতের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সাম্প্রতিক চুক্তি নিয়ে আশাবাদও আরও গতি জুগিয়েছে, যা পাউন্ডে বিস্তৃত ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মার্কিন ডলারের সার্বিক পতনে পণ্যনির্ভর মুদ্রাগুলো সমর্থন পেয়েছে। তবে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং বাজারের সতর্ক মনোভাবের কারণে AUD ও NZD, CAD-এর তুলনায় পিছিয়ে ছিল। AUDUSD এবং NZDUSD সাম্প্রতিক ক্ষতি পুষিয়ে নিয়েছে, আর USDCAD টানা তৃতীয় দিনের মতো কমে দুই সপ্তাহের সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছেছে।
কানাডার প্রধান রপ্তানি পণ্য ক্রুড অয়েলের দাম তীব্রভাবে বেড়ে যাওয়া এবং মূল্যস্ফীতির শক্তিশালী তথ্য কানাডিয়ান ডলারের উত্থানে সহায়তা করেছে। এতে BoC-এর সুদের হার কমানোর প্রত্যাশা কমেছে। বিপরীতে, অস্ট্রেলিয়ার Westpac Leading Index উন্নত হয়েছে এবং নিউজিল্যান্ডে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা বেড়েছে। তবে নিউজিল্যান্ডের মিশ্র বাণিজ্য তথ্য ও চীন-সংক্রান্ত উদ্বেগ অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মুদ্রার আরও উত্থান সীমিত করেছে।



ইসরায়েল শিগগিরই ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালাতে পারে—এমন খবরের জেরে চার দিনের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় WTI ক্রুডের দাম এক মাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার মধ্যে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বেড়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মজুত বৃদ্ধি, OPEC+ উৎপাদন বাড়ানোর সম্ভাবনা এবং ইউক্রেন যুদ্ধবিরতির সঙ্গে সম্পর্কিত রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার সম্ভাবনার মতো দরপতনের ইঙ্গিত থাকা সত্ত্বেও দাম বেড়েছে।
এদিকে, টানা তৃতীয় দিনের মতো স্বর্ণের দাম বেড়েছে। এক মাসের পুরোনো রেজিস্ট্যান্স ভেঙে দাম 12 মে-র পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশ্বজুড়ে ঝুঁকি এড়ানোর প্রবণতা, দুর্বল মার্কিন ডলার এবং চীনে স্বর্ণের চাহিদা 11 মাসের সর্বোচ্চে পৌঁছানোর খবর এই ঊর্ধ্বগতিকে ত্বরান্বিত করেছে।
কারিগরি ব্রেকআউট ও দুর্বল মার্কিন ডলারের প্রভাবে Bitcoin চার মাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে, আর Ethereum শক্ত অবস্থানে রয়েছে। জুনের FOMC বৈঠকের আগে সতর্ক মনোভাব এবং নতুন, ক্রিপ্টো-বান্ধব নেতৃত্বে SEC-এর অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও এই ঊর্ধ্বগতি এসেছে।
যুক্তরাজ্যের মুদ্রাস্ফীতির তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। সামনে রয়েছে শুধু কানাডার আবাসনবিষয়ক তথ্য এবং মাঝারি পর্যায়ের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বক্তব্য। তাই বাজারের নজর এখন ভূরাজনীতি, যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ নিয়ে উদ্বেগ এবং বাণিজ্য উত্তেজনার দিকে থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধি মন্থর হওয়ার আশঙ্কা, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের ঝুঁকি এবং যুদ্ধের হুমকি ইতিবাচক খবর এলেও USD-এর যেকোনো পুনরুদ্ধার সীমিত করতে পারে। অন্যদিকে, নেতিবাচক শিরোনাম ডলারের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এই পরিস্থিতি সোনা ও ইয়েনের মতো নিরাপদ আশ্রয়ের পক্ষে যেতে পারে। অন্যদিকে, ইউরো, পাউন্ড এবং পণ্যভিত্তিক কারেন্সিগুলো সাম্প্রতিক লাভ ধরে রাখতে পারে। এদিকে, দিকনির্দেশনা স্পষ্ট হওয়ার অপেক্ষায় ক্রুড অয়েল ট্রেডাররা EIA-এর যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক মজুত-তথ্যের দিকে তাকিয়ে আছেন।
ট্রেডিংয়ে ভাগ্য আপনার সহায় হোক!